‘জুলাই জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যা ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি সরানো হয়েছে’: নাহিদ ইসলাম
জুলাই ৩৬ গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর থেকে সীমান্ত হত্যা ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
শনিবার সকালে জুলাই জাদুঘর পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ অভিযোগ করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জাদুঘরে আগে সীমান্ত হত্যার একটি সেগমেন্ট ছিল। সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও অন্যান্য ভারতীয় বাহিনীর হাতে নিহত বাংলাদেশিদের তালিকার পাশাপাশি ফেলানী হত্যাকাণ্ডের একটি ভাস্কর্যও ছিল। তবে সেগুলো এখন আর নেই বলে দাবি করেন তিনি। একইভাবে মোদিবিরোধী আন্দোলনের কিছু স্মৃতি ও আলোকচিত্রও সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এসব ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য ইতিহাসের কোনো অংশ বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। ইতিহাসকে পূর্ণাঙ্গভাবে সংরক্ষণ করে জাদুঘরে তুলে ধরার দাবি জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাসের উপস্থাপনাও পরিবর্তিত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি যেন তৈরি না হয়, সে জন্য জাদুঘরে একটি জাতীয় চরিত্র নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো বা মন্দ—এভাবে দেখার বিষয় নয়; সম্পর্ক হওয়া উচিত মর্যাদাপূর্ণ। তাঁর অভিযোগ, গত ১৬ বছরে দেশে যে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার সঙ্গে ভারত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্নভাবে সম্পর্কিত ছিল। অথচ জাদুঘর পরিদর্শন করলে দেশের ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে কোনো বৈদেশিক শক্তির সম্পৃক্ততা ছিল না এমন ধারণা তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশে ভারতীয় আগ্রাসন এবং মোদিবিরোধী আন্দোলনের যে বিষয়গুলো ছিল, সেগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য ইতিহাসের এসব অংশ বাদ দেওয়া হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
জুলাই জাদুঘর পরিচালনার কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় জাদুঘর পরিচালনা করলে এর কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বায়ত্তশাসিত কাঠামোর মাধ্যমে জাদুঘর পরিচালনার দাবি জানান তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমানে জাদুঘরে পর্যাপ্ত জনবল নেই। প্রায় ২০০ জনের মতো জনবল প্রয়োজন হলেও বর্তমানে ১৫ থেকে ২০ জন কাজ করছেন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে তাঁকে জানানো হয়েছে। এতে জাদুঘরের নিরাপত্তা ও পরিচালনা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জাদুঘরটি সঠিকভাবে পরিচালনা ও সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখতে দ্রুত জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের আহ্বান জানান নাহিদ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদসহ অন্য শহীদদের স্মৃতিচিহ্ন আরও বিস্তৃতভাবে প্রদর্শনেরও দাবি জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে বর্তমানে প্রদর্শিত স্মৃতিচিহ্নের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি নিদর্শন জাদুঘরে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো আরও শৈল্পিক ও পরিকল্পিতভাবে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
নাহিদ ইসলাম জানান, আবু সাঈদকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানিয়েছে। তবে জাদুঘরের বাইরে ১৭ একর জায়গাজুড়ে যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ তাঁকে বিস্তারিত জানাতে পারেনি।
গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা গণভবনে প্রবেশ করে এবং সেখানে বিজয় উদ্যাপন করে। জুলাইয়ের ভাষায় দিনটিকে ‘৩৬ জুলাই’ বলা হয়। তাঁর দাবি, গত ১৬ বছর ধরে গণভবন নির্যাতন, স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
তিনি বলেন, গণভবন থেকেই তৎকালীন সরকার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিত, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, অর্থনৈতিক লুটপাট ও দুর্নীতিসহ নানা কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নির্যাতন, মানুষের প্রতিরোধ ও বিজয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাদুঘরের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়েছে। এটিকে আরও কার্যকর ও ইতিহাসনির্ভর করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
পরিদর্শনকালে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, এনসিপির নারী সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুমসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।