‘বিদ্যুৎ সংকটের মূল সমস্যা কয়লা নয়, আমদানিনির্ভরতা ও বেসরকারিকরণ’
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ কয়লা নয়, বরং আমদানিনির্ভরতা ও জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণের রাজনৈতিক অর্থনীতি এমন মন্তব্য করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
তিনি বলেন, দেশে আগামী ৫০ থেকে ৬০ বছর ব্যবহারের মতো কয়লা মজুদ থাকার পরও পরিবেশের অজুহাতে তা ব্যবহার না করে উচ্চমূল্যের এলএনজি, আমদানিকৃত কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং জনগণের বিদ্যুৎ বিল সবই বেড়েছে।
রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘জ্বালানি খাতে অরাজকতা ও ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল’ বন্ধের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যারিস্টার ফুয়াদ বলেন, পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ ব্যবহারের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশ দীর্ঘদিন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, সীমিত প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় অংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হলেও ইউরিয়া সার উৎপাদন, রপ্তানিমুখী শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই গ্যাসকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার, শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে ব্যবহারের দাবি জানান তিনি।
কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমালোচনা করে এবি পার্টির এই নেতা বলেন, কুইক রেন্টালের মাধ্যমে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার যে ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার আর্থিক বোঝা এখনো জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়ার কারণে রাষ্ট্র আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
জ্বালানি খাত বেসরকারিকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, এবি পার্টি বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে নয়। তবে তা হতে হবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। জ্বালানিকে শুধু পণ্য হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।
ফুয়াদ প্রশ্ন তুলে বলেন, গ্যাস সরবরাহে নিয়োজিত ছয়টি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলেই ৬৩ হাজার কোটি টাকার বকেয়া বিলের সমস্যার সমাধান হবে—এর নিশ্চয়তা কোথায়?
একটি বেসরকারি কোম্পানিকে দেশের জ্বালানি তেল আমদানি ও সরবরাহের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে সরকার বাজার কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। জ্বালানি খাতে একক বা অতিরিক্ত বাজার নিয়ন্ত্রণ ঠেকাতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে দেশীয় কয়লা ও গ্যাসের পরিবেশসম্মত ও সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৌর, বায়ু ও পানিবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ১০ থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়।
এ ছাড়া উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট পুনর্মূল্যায়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় চুক্তি ও ব্যয়ের স্বাধীন জাতীয় অডিট, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং গ্যাসকে সার, শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দের দাবি জানায় এবি পার্টি।
ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল বন্ধে শুধু মিটার পরিবর্তন যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে ফুয়াদ বলেন, বিদ্যুতের মালিকানা, কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ও বিতরণ—পুরো ব্যবস্থাকে নতুন করে সাজাতে হবে। ভারতীয় মিটার আমদানির মাধ্যমে জনগণ কতটা সেবা পাচ্ছে এবং এসব মিটারের সঙ্গে ভুতুড়ে বিলের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে তদন্তেরও দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত কম আমদানি, কম খরচ এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ। জ্বালানি খাতকে জনগণের সেবা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের ক্ষেত্র হিসেবে নয়।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মেজর (অব.) আবদুল ওয়াহাব মিনার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমানসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।