২৩ কোটির প্রকল্পে ২০ কোটিই গায়েব: ১৬ বছরেও তৈরি হয়নি সায়দাবাদ-এনায়েতপুর সড়ক
যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে সিরাজগঞ্জের সায়দাবাদ-এনায়েতপুর ধীরগতির যানবাহন চলাচলের সড়কটি। নির্মাণকাজ শেষ না হতেই প্রকল্প বাতিল করা এবং ঠিকাদারকে ২০ কোটি টাকা বিল পরিশোধের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহন মালিক ও চালকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ জানিয়েছে, সাবেক সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ও নকশাগত ত্রুটির কারণেই প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়েছে।
প্রকল্পের পটভূমি ও দীর্ঘসূত্রতা:
তাঁতশিল্প সমৃদ্ধ সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা, খাজা এনায়েতপুরী (রহ.) মাজার এবং খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম সায়দাবাদ-এনায়েতপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক। সড়কটিতে প্রতিনিয়ত যানজট নিরসন ও দুর্ঘটনা কমাতে ২০১০ সালে ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি পার্শ্ব সড়ক (ধীরগতির যানবাহন চলাচলের জন্য) নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
অপচয় ও দখলদারিত্ব:
অভিযোগ উঠেছে, সড়ক নির্মাণের নামে সে সময় রাস্তার পাশের হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয় সেই গাছগুলো বিক্রি করে হরিলুট করা হয় কোটি কটি টাকা। কিন্তু গত ১৬ বছরেও সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করা হয়নি। উল্টো কাজ অসমাপ্ত রেখেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ২০ কোটি টাকা বিল প্রদান করা হয় । যে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায় ঠিকাদার। আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করার আগেই সড়কটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করায় এখন রাস্তার উভয় পাশের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা
সড়কের প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় এবং তদারকি না থাকায় খোদ খাড়াখুড়ি করা রাস্তার ওপর ফেলে রাখা হয়েছে বড় বড় গাছের গুড়ি, ইট, পাথর ও বালু। অনেক স্থানে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট ও বাজার। বিশেষ করে সড়কের গুরুত্বপূর্ণ চারটি পয়েন্ট—সমেশপুর, চালা বাজার, মুকুন্দগাতি বাজার ও বেতিল মোড়ে প্রতিদিন লেগেই থাকে তীব্র যানজট ও প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের অগ্রগতি না দেখিয়েই হরিলুট করা হয়েছে সরকারি অর্থ। কাজ না করেই ঠিকাদার কেটে পড়েছেন, অথচ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
জন অসন্তোষ ও আইনি প্রতিক্রিয়া:
প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন চালকরা। মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ সিরাজগঞ্জ ইউনিটের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. শহিদুল ইসলাম জানান, এটি সরকারি অর্থের চরম অপচয় এবং সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতির স্পষ্ট প্রমাণ। তিনি এই অনিয়মের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত সড়কটি চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানান।
সওজ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নতুন পরিকল্পনা
সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমরান ফারহান সুমেল জানান, নকশাগত ভুল ও তৎকালীন সরকারের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ২৩ কোটি টাকার এই প্রকল্পটির পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি, তবে ঠিকাদারকে ২০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমান সংকট নিরসনে সায়দাবাদ থেকে বেড়া পর্যন্ত ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ‘স্ট্যান্ডার্ড টু-লেন’ সড়ক নির্মাণের নতুন প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। সম্ভাব্য ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই নতুন সড়কটি নির্মিত হলে যমুনা সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়ক থেকে পাবনাগামী যানবাহনগুলো সায়দাবাদ হয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার কম দূরত্বে যাতায়াত করতে পারবে।