Global Header Bottom
রেকর্ড উৎপাদনের পরও সংকটে দেশের চা-শিল্প, টিকে থাকতে চাইছে ন

রেকর্ড উৎপাদনের পরও সংকটে দেশের চা-শিল্প, টিকে থাকতে চাইছে নীতিগত সহায়তা

রেকর্ড উৎপাদনের পরও সংকটে দেশের চা-শিল্প, টিকে থাকতে চাইছে নীতিগত সহায়তা

ব্রিটিশ আমল থেকে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে বাংলাদেশের চা-শিল্প। সময়ের সঙ্গে চা উৎপাদনে রেকর্ড সৃষ্টি হলেও উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির কারণে শিল্পটি এখন তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বাড়লেও ন্যায্যমূল্য ও প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার অভাবে অধিকাংশ চা-বাগান লোকসানের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ১০ কোটি ২ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়। ২০২৪ সালে উৎপাদন হয় ৯ কোটি ৩০ লাখ কেজি এবং ২০২৫ সালে ৯ কোটি ৪৯ লাখ কেজি। চলতি ২০২৬ সালে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি।

তবে উৎপাদন বাড়লেও জ্বালানি, সার, কীটনাশক, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতি কেজি চা উৎপাদনে গড় ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৬০ টাকা। অথচ নিলামে গড় বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ২০৮ টাকা ৮৮ পয়সা। ফলে প্রতি কেজিতে গড়ে ৫১ টাকা ১২ পয়সা লোকসান গুনতে হয়েছে চা-বাগানগুলোকে।

সংস্থাটির তথ্য বলছে, গত এক দশকে চা উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ৭৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। অন্যদিকে ২০০২ সালের পর থেকে দেশের চা রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৯ শতাংশ।

চা-বাগান মালিকদের অভিযোগ, চা-শিল্পকে কৃষিখাতের পরিবর্তে শিল্পখাত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করায় তাদের উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। অতীতের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক বাগান নতুন করে ব্যাংক ঋণও পাচ্ছে না।

অন্যদিকে শ্রমিক নেতাদের দাবি, বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় চা-শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এখনও পর্যাপ্ত নয়।

চাতলাপুর চা-বাগানের ব্যবস্থাপক শুভঙ্কর চন্দ্র নাথ বলেন, উৎপাদন বাড়লেও অধিকাংশ বাগানের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। উৎপাদন ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক বাগান পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দাম পেতে উচ্চমানের চা উৎপাদনের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজড়া বলেন, বর্তমানে চা উৎপাদনের সার্বিক অবস্থা আগের তুলনায় উন্নত হলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এদিকে সংকট উত্তরণে গঠিত সরকারি টাস্কফোর্স আটটি অগ্রাধিকার খাতে ৫৯টি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চা-বাগানকে পুনরায় কৃষিখাত হিসেবে ঘোষণা, ছয় শতাংশ সরল সুদে ঋণ সুবিধা, পুরোনো ঋণ পুনর্গঠন, ভ্যাট কমানো, পুরোনো চা গাছের পুনরোপণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

এ ছাড়া চা-শিল্পকে আর্থিকভাবে সহায়তা দিতে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকার ‘টি সেক্টর অ্যাসিস্ট্যান্স ফান্ড’ গঠনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় চা পুনরোপণ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ, নিজস্ব জাতীয় চা ব্র্যান্ড তৈরি, দেশীয় চায়ের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি অর্জন এবং পাকিস্তান, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও পানিসংকটসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও দেশের চা-শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ শিল্পকে পুনরায় লাভজনক করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি করলেই হবে না; উৎপাদন ব্যয় কমানো, নিলামে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি টাস্কফোর্সের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের সম্ভাবনাময় চা-শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

শেয়ার করুন:

এই ক্যাটাগরির আরও নিবন্ধ

Global Before Footer